নিউজ ডেস্ক: অনেক দিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে চিড়েচ্যাপ্টা স্বল্পআয়ের মানুষ; ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরেই অবস্থান করছে। এর মধ্যেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তাদের অতি মুনাফা করার এ প্রবণতার মাসুল গুনছে সাধারণ মানুষ; ক্রমেই আরও কষ্টকর হয়ে পড়ছে জীবনযাপন। দামের সঙ্গে পেরে উঠছে না মানুষ। পণ্যমূল্যে স্বস্তি ফেরাতে সরকার পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি আমদানির অনুমতি ও নিয়মিত তদারকি অভিযান চালালেও এ থেকে পরিত্রাণ মিলছে না।
সরকারি তথ্যেই গত সেপ্টেম্বরে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে পুরো দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা উদ্বেগজনক। পাশাপাশি আমদানিতে কড়াকড়ি ও ডলার সংকটের কারণে বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এমন সংকটকালে মওকা বুঝে হঠাৎ-হঠাৎ সরবরাহ-সংকট সৃষ্টি করে বিভিন্ন পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেনি, কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানান সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অস্বাভাবিক মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এ ক্ষেত্রে সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকার ফাঁকে চলছে একের পর এক কারসাজি। পর্যাপ্ত উৎপাদন সত্ত্বেও দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। অথচ, বাজার অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেসবের সুফল বাস্তবে মিলছে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তা কাজে আসছে না। উল্টো তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। উপরন্তু বাজারে বিরাজ করছে অব্যবস্থাপনা। সমস্যার গোড়ায় হাত না দিচ্ছে না সরকার। কারসাজি যদি হয়ে থাকে, তাহলে কারসাজিকারীদের ধরতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ, নতুনরা বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। তাদের সামনে অনেক বাধা। সামান্য ট্রেড লাইসেন্স খুলতে গিয়েই তারা নাজেহাল হচ্ছেন। অপরদিকে বাজারে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হলেও প্রান্তিক কৃষক, খামারিরা লাভবান হচ্ছেন না, উল্টো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বর্তমানে বাজারে ভোক্তার গলায় কাঁটা বিঁধিয়ে দিচ্ছে পেঁয়াজ, আলু ও ডিমের দর। সরকার প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা বেঁধে দেওয়ার পরও বাজারে এর চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বৃদ্ধির খবরে পণ্যটির দাম রাতারাতি আরও বেড়ে গেছে; বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৫০ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে আলুর ভালো ফলন হওয়ার পরও সরবরাহ কম দেখিয়ে অতিরিক্ত দামে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে ১৫ টাকায় কেনা আলু বর্তমানে খুচরায় ৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকারের নির্ধারিত দাম ৩৫-৩৬ টাকা ¯্রফে ঘোষণাতেই রয়ে গেছে। শেষমেশ আলুও আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে বাজারে স্বস্তির আভাস মিলছে না। অন্যদিকে সরকার প্রতি পিস ডিমের দাম ১২ টাকা বেঁধে দিলেও বাজারে কিন্তু ১৫ টাকা দরেই বিক্রি হচ্ছে। ডিমও আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলায়নি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যবসায়ীদের অবৈধ সিন্ডিকেট ভাঙার পাশাপাশি পৃথক ভোক্তা মন্ত্রণালয়ের দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে কিংবা বাজারে অল্পসংখ্যক অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ কঠিন। এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সঠিক মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরবরাহেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। প্রয়োজনে সরাসরি আমদানি করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। যদিও দেশে উৎপাদন বাড়াতেই হবে। কারসাজিকারীরা চিহ্নিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের মতো এককভাবে কোনো সংস্থার পক্ষে বা এককভাবে কোনো নীতি প্রয়োগ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তা ছাড়া সংস্থাটির জনবলও অপ্রতুল। সরকারের নীতি তৈরিতে যাতে ভোক্তাদের স্বার্থ প্রতিফলিত হয় সে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আলাদা বিভাগ কিংবা মন্ত্রণালয় থাকা প্রয়োজন।
বাজারে আমিষের দাম অনেক আগেই ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমান বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগির দাম ৩১০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। গরুর মাংস কেজি ৭৮০ টাকা, খাসি ১১০০ টাকা। সস্তার পাঙাশের কেজি এখন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্বল্প দামের সবজিও এখন দামি পণ্য।
বাজারের এমন দশায় স্বল্পআয়ের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ব্যয়ের চাপে পিষ্ট ক্রেতারাও এখন তিন ভাগে বিভক্ত। কেউ অনায়াসে কিনছেন দামি সবজি। কেউ কিনছেন একটি করলা, একটি বেগুন কিংবা ২৫০ গ্রাম করে তরিতরকারি। কেউ আবার বাজারে না ঢুকে এর আশপাশে টুকরি নিয়ে বসা পুরনো, বাসি-নষ্ট সবজির দোকানে ভিড় করছেন অগ্নিমূল্যের বাজারে দরিদ্রের শেষ ভরসা শাক। সেই শাকও চলে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে শাকের আঁটি সরু হচ্ছে, অন্যদিকে পুরু হচ্ছে দাম। এক আঁটি লালশাকও এখন অন্তত ৩০ টাকা, লাউশাক ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বাজারে নতুন করে আটার দাম বেড়েছে। ১১০ টাকায় বিক্রি হওয়া ২ কেজির আটার প্যাকেট এখন ১২০ টাকা হয়েছে। মোটা দানার মসুর ডালের পাশাপাশি চালের দামও বেড়েছে। চিকন চালের দাম অনেকটা অপরিবর্তিত থাকলেও মাঝারি চালের কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা এবং মোটা চালে ২ টাকা বেড়েছে। কোথাও কোথাও মোটা চালে ৪ টাকাও বেড়েছে। সরকার চিনি আমদানিতে শুল্ক অর্ধেক কমানোর পর রাজধানীর পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম নিম্নমুখী হওয়ার বদলে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এতদিন পাইকারিতে ১২৯ টাকা দরে চিনি মিললেও সম্প্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তি রয়েছে।