বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এর বিরুদ্ধে গত ১৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ টেলিভিশনটির কর্মকর্তাদের স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির শিকার হয়ে কালো তালিকাভুক্তও করা হয় অনেক শিল্পীকে। বিশেষ করে বিটিভি’র ঢাকা কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোছা. মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বেশ পুরনো। তার বিরুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠানের ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চলতি বছরের শুরুতে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক সূত্রে যানা যায়, সেই অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এদিকে কোটা আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে দেয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গুঞ্জন রয়েছে, সে সময় বিটিভি’র ভেতরের নথিও সরিয়ে ফেলা হয়। এ ছাড়া দলীয় শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান, অডিশনের নামে টাকা আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ রয়েছে মাহফুজার বিরুদ্ধে। তিনি ২০০৭ সালে পিএসসি’র মাধ্যমে প্রযোজক হিসেবে বিটিভিতে যোগদান করেন। ২০২২ সালে তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে যোগদান করেন। তাকে চলতি দায়িত্বে জিএম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ৬ মাসের জন্য। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই মেয়াদ বাড়ানোর নিয়ম আছে। মেয়াদ বাড়ানো হলে তা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানোর কথা। তবে বিটিভি’র প্রশাসন জানিয়েছে, তারা মেয়াদ বাড়ানোর কোনো প্রজ্ঞাপন পায়নি। তবে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়ে গেলেও এখনো মাহফুজা আক্তার রয়েছেন বহাল তবিয়তে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছেন। এখন মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছেন শিল্পী সমাজ থেকে শুরু করে বিটিভি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মকর্তাও। এদিকে মাহফুজা আক্তারের পাশাপাশি বিটিভি’র মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমেরও অপসারণ চেয়েছেন শিল্পীরা। বিষয়টি নিয়ে বিটিভি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, বিটিভির মহাপরিচালক ও জিএম এখনো অফিস করছেন। তাদের মাধ্যমেই চলছে সব। তবে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন অন্যান্য কর্মকর্তারা। তারাও এ দুই কর্মকর্তার অপসারণ চান। এদিকে বিষয়টি নিয়ে মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী শিল্পী ও কলাকুশলীরা। দীর্ঘদিন ধরে তারা রাষ্ট্রায়ত্ত এই টেলিভিশন চ্যানেল থেকে দূরে ছিলেন। বিটিভি’র কর্মকর্তাদের স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বঞ্চিতদের সৃজনশীলতা। বঞ্চিত এই শিল্পী, সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও কলাকুশলীরা মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিটিভি ভবনের সামনে কর্মসূচি পালন করেন। এতে বিটিভি’র ডিজি, জিএমসহ দুর্নীতিতে যুক্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ চান তারা। এ আয়োজনের আহ্বায়াক সংগীত পরিচালক শেখ সাদি খান বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে বছরের পর বছর যোগ্যদের মূল্যায়ন নেই, বিভিন্ন অডিশনে মেধাবীদের বাদ দিয়ে কর্তৃপক্ষের পছন্দের লোকদের মূল্যায়ন করা হয়। অডিশনের নামে যা তা হয়েছে, এটা বন্ধ হোক। মেধাবীদের মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। শিল্পাঙ্গন থেকে দুর্নীতি, অরাজকতা দূর হোক। তার জন্য বিটিভি’র বর্তমান ডিজি ও জিএম এর অপসারণ দরকার। এদিকে মঙ্গলবার মুক্ত শিল্পী সমাজ বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলন থেকেও একই দাবি জানানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিটিভি’র ডিজি ও জিএম-এর অপসারণের দাবি জানিয়েছেন অনেক সংগীতশিল্পী, যারা গত ১৬ বছর ধরে বঞ্চিত হয়েছেন। বিটিভিতে যোগ্যতা সত্ত্বেও গান গাওয়ার সুযোগ পাননি। এ অবস্থানের অবসান চান তারা। এ বিষয়ে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সোহেল মেহেদী বলেন,
বিটিভিতে আমাকে ডাকে না অনেক বছর। শেষ কবে বিটিভিতে গিয়েছি তা মনে পড়ে না। তৌহিদ, মাহফুজা গং বেছে বেছে শুধু তাদের শিল্পীদেরকেই ডাকে। বিটিভি’র জিএম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার থেকে শুরু করে সকল শাখায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।