প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে তড়িৎ কৌশল বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি গনভিল অ্যান্ড কেইয়াস কলেজের ছাত্র ছিলেন। এছাড়া তিনি ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ-এর আজীবন ফেলো, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির আজীবন ফেলো, যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (আই.ই.টি)-এর ফেলো, যুক্তরাজ্যের ইঞ্জিনিয়ারিং কাউন্সিল-এর চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার। সম্প্রতি নিজের শিক্ষাজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সম্পর্কে কথা হয় নিউজ পরিক্রমার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেজাউল ইসলাম সেলিম
আমাদের সময় : ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে ও উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
ড. সাইফুল ইসলাম : উপাচার্য হওয়ার ব্যাপারটি অবশ্যই আমার জন্য আনন্দের। সরকারি ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমার জন্য তৃতীয়বার। গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে কর্মমুখী শিক্ষার বাস্তবায়ন ও সহজলভ্য করার লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও বহু গ্রন্থের প্রণেতা ড. এ বি এম মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এখানে এসে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা যেমন পাচ্ছি তেমনি নানা রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। ছাত্রছাত্রীরা একাডেমিক কার্যক্রমে নিজেদের মেধাকে শুধু সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং বছরের বিভিন্ন সময় ফুটবল টুর্নামেন্ট, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ইনডোর গেমস, ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরের আয়োজনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ ইউনিভার্সিটিতে একটি বিতর্ক ক্লাব রয়েছে। ক্লাবটি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
আমাদের সময় : আপনি বললেন চ্যালেঞ্জের কথা সেগুলো কী কী?
ড. সাইফুল ইসলাম : আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেই তখন করোনা সময় চলছিল। এই সময় শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটায় অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় আমরা অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করি। অনলাইনে ক্লাস নেওয়াটা ছিল চ্যালেঞ্জের। এছাড়া আমরা স্বশরীরে এসে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে মিটিং করতে হয়েছে। আপনারা জানেন ইউজিসির আদেশ ছিল দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। অতি দ্রুত সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিফট করা ছিল আমাদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। আমাদের বর্তমান ক্যাম্পাসটি প্রথমে শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেলের জন্য প্রস্তুত হলেও ইউজিসির আদেশ বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাস রূপান্তরিত করি।
আমাদের সময় : আপনার কী মনে হয় করোনাকাল আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিল?
ড. সাইফুল ইসলাম : দেখুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের বাইরেও কিছু কার্যক্রম থাকে। একসঙ্গে কোথাও খেতে যাওয়া, দলবেঁধে ফুটবল খেলা ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন শিক্ষার্থীর জন্য। বেশিরভাগ মানুষ জীবনের সেরা বন্ধুটাকে পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। আর এখানেই এসে একজন শিক্ষার্থী পৃথিবীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত সেটা সে তৈরি করতে পারে। এর জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য।
আমাদের সময় : বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা অধিকতর প্রযুক্তিনির্ভর। এই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়াটা শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা কল্যাণকর বলে আপনি মনে করেন?
ড. সাইফুল ইসলাম : শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি নির্ভরতা হয়ে পড়া এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। আপনি প্রযুক্তি ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারবেন না বর্তমান সময়ে। উন্নত দেশসমূহে শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের ব্যপারে আমাদের চেয়ে তারা অনেকদূর এগিয়ে। আর এখনকার শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির মাধ্যমেই শিখবে ও আধুনিক দুনিয়ার সঙ্গে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রযুক্তি আমাদের জন্য নতুন কী হাজির করবে, আমরা জানি না। আপনি পছন্দ করেন বা না করেন, নতুন নতুন প্রযুক্তি তো আসবেই। এর সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির বাইরে থেকে সনাতনী পন্থায় শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা তথা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হলে উন্নত বিশে^র সঙ্গে দূরত্বই তৈরি হবে। আর এই দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে।
আমাদের সময় : আপনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গনভিল অ্যান্ড কেইয়াস কলেজের ছাত্র ছিলেন। সেই সময়কার স্মরণীয় ঘটনা জানতে চাই।
ড. সাইফুল ইসলাম : প্রতিটা দিন ছিল আমার জন্য স্মরণীয়। আমার যিনি সুপারভাইজার ছিলেন তিনি অসম্ভব জ্ঞানী ও জিনিয়াস লোক ছিলেন। তিনি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন শুধু নোবেল প্রাইজ ছাড়া। তিনি আমার জীবনে একটা অংশ হয়ে থাকবে। উনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং শিখিয়েছেন। আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদেরকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। স্মরণীয় ঘটনা বলতে গেলে শেষ হবে না এত অল্প সময়ে বলে। প্রতিটা দিন আমার জন্য যেমন দারুণ ছিল তেমনি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।
আমাদের সময় : আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে আপনি কী মনে করেন?
ড. সাইফুল ইসলাম : প্রধান কারণ আমি মনে করি পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করে বের হচ্ছে। আর বের হয়েই কাক্সিক্ষত চাকরি পাচ্ছে না। এতে করে আমাদের দেশে বেকারদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরেকটা কারণ হতে পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক মান উন্নত বিশে^র তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা। তৃতীয় বিশে^র অনেক দেশেই কম-বেশি এটা রয়েছে এবং থাকবে। তবে যুগের চাহিদানুযায়ী গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতের ব্যাপারে কাজ করলে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশের ভেতরে যথাযথ কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে পারলে এর উন্নতি হওয়া সম্ভব। আর এটাই পারে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা কমিয়ে আনতে। সেই লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছে উন্নত বিশ্বের আদলে। এছাড়া আমাদের সাবেক শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় দেশ এবং দেশের বাইরেও সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
আমাদের সময় : ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গবেষণা ও উদ্ভাবনে কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
ড. সাইফুল ইসলাম : ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল গবেষণামুখী করার প্রয়াস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে একদল অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী। এছাড়া বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য নিয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ শিক্ষক বা গবেষক নিয়োগসহ কারিগরি শিক্ষা উপকরণসমূহ, যুগোপযোগী গবেষণাগার এবং গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে তৎপর রয়েছে। খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গঠিত টিম ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে। অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ও ইউজিসির পরামর্শ ও সহায়তায় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দেশ ও জাতি গঠনে কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।